মঙ্গলবার, ১৩ এপ্রিল ২০২১, ১২:৫৮ অপরাহ্ন

ঈশ্বরচন্দ্রের জীবন ও কর্ম ‘বিদ্যাসাগর’ চলচ্চিত্র

নুরুন্নবী নুর / ১৬৮ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে
প্রকাশের সময় : শনিবার, ৩০ জানুয়ারী, ২০২১

‘বিদ্যাসাগর’ একটি জীবনীভিত্তিক চলচ্চিত্র। ১২৩ মিনিট দৈর্ঘ্যের সাদাকালো চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায় ১৯৫০ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর। উপাধি প্রাপ্ত ‘বিদ্যাসাগর’ এর পারিবারিক নাম ঈশ্বরচন্দ্র শর্মা হলেও অধিক পরিচিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর নামে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জীবন ও কর্ম তথা লেখক, দার্শনিক, পণ্ডিত, শিক্ষাবিদ, অনুবাদক, প্রকাশক, সংস্কারক, মানবহিতৈষী যতো ধরনের বিশেষণ আছে, সবগুলো বিশেষণকে ভিত্তি করে নির্মিত হয়েছে ‘বিদ্যাসাগর’ চলচ্চিত্র। বাংলা সাহিত্য আন্দোলনে তিনি বাংলার নবজাগরণ ঘটিয়েছেন। তিনি ‘কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপোস্য’ বা ‘কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপো সহচরস্য’ ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন।

সনাতন তথা হিন্দু সমাজ বা হিন্দু ধর্মে কিছু গোঁড়ামি ধর্মাচার হিসেবে মানা হয়, যা কালের বিবর্তনে পালন করা অনুচিত হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা হিন্দু সংস্কার বা দেশাচার বলে অভিহিত করা হতো। হিন্দু ধর্মালম্বীরা সনাতনী ধারা বজায় রাখতে গিয়ে ঘটে নানান বিপত্তি। তার মধ্যে অন্যায় আচার বা সংস্কৃতি বা প্রথা পালনের ফলে দেশে মানবিকতা ক্ষুণ্ন হচ্ছে, পাশাপাশি সুষ্ঠু বিচার বিশ্লেষণের অভাব হেতু ভিন্ন ধর্মে দীক্ষিত হওয়া অন্যতম। এছাড়াও বহুবিবাহ প্রথা তো আছেই। এরূপ প্রাচীন চিন্তা ধারা থেকে বের হয়ে আসতে একটা সংগ্রামের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। শাস্ত্রের অপব্যাখ্যা থেকে বের করে আনতে একজন ঋষির খুব দরকার হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। শেষ পর্যন্ত শাস্ত্রের সঠিক ব্যাখ্যা বের করে এনে অন্ধকার থেকে আলোতে আনতে সক্ষম হন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।

‘পাণ্ডিত্য, শিক্ষা বিস্তার, সমাজ সংস্কার, দয়া ও তেজস্বিতায় ঈশ্বচন্দ্র বিদ্যাসাগর (পাহাড়ি সান্ন্যাল) ছিলেন উনিশ শতকের বাংলায় একক ব্যক্তিত্ব। তার প্রজ্ঞা ছিলো প্রাচীন ভারতীয় ঋষির মতো, শৌর্য ছিল ইংরেজদের মতো, আর হৃদয় ছিল বাংলার কোমল মতি মায়েদের মতো। এই অসাধারণ যুগ প্রবর্তক মহাপুরুষের জন্ম হয়েছিলো ১৮২০ সালে মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামে। তিনি তার তেজস্বিতা, সত্যনিষ্ঠা অর্জন করেছিলেন তার দরিদ্র বাহ্মণ পিতা ঠাকুরদাস বন্দোপাধ্যায়ের কাছ থেকে; আর হৃদয়ের মমত্ববোধ তার মা ভাগবতী দেবীর কাছ থেকে।

দারিদ্র্যের কারণে রাতে বাতি জ্বালিয়ে পড়ার ক্ষমতা ছিল না। ফলে শিশু ঈশ্বরচন্দ্র সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত রাস্তার গ্যাস বাতির নিচে দাঁড়িয়ে পড়াশোনা করতেন। তিনি ইংরেজি সংখ্যা গণনা শিখেছিলেন তার বাবার সঙ্গে গ্রামের বাড়ি থেকে পায়ে হেঁটে কোলকাতায় আসার সময়, রাস্তার পাশের মাইল ফলকের সংখ্যার হিসাব গুণতে গুণতে। ১৯৩৯ সালে ১৯ বছর বয়সে সংস্কৃত কলেজ তাকে ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধিতে ভূষিত করেন। অসাধারণ মেধা আর অধ্যাবসায়ের গুণে তিনি মাত্র ২১ বছর বয়সে সংস্কৃত সাহিত্য, ব্যাকরণ, ন্যায়, বেদান্ত, স্মৃতি, অলঙ্কার ইত্যাদি বিষয়ে অগাধ পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিলেন। ওই বয়সে তিনি ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতের দায়িত্ব লাভ করেন। একই সঙ্গে তিনি পুরুষ-নারী লোকের শিক্ষা বিস্তারের জন্য ইংরেজ সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় বিদ্যালয় পরিদর্শকের দায়িত্বও পালন করেন। অবশ্য সিপাহী বিদ্রোহের কারণে রাজকোষে অর্থ সংকট দেখালে দিলে, তিনি নিজেই বেসরকারিভাবে বিদ্যালয় পরিচালনার ভার গ্রহণ করেন।

কর্ম জীবনে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে তিনি সাহিত্য চর্চায়ও মনোযোগী হন। বাংলা ভাষায় উন্নতমানের পাঠ্যপুস্তকের অভাব দেখে তিনি গদ্য সাহিত্য রচনা শুরু করেন। তিনি বাংলা গদ্য সাহিত্যকে নব জীবন দান করেন। এ জন্য তাকে বাংলা গদ্যের জনক বলা হয়। শিশুদের লেখাপড়া সহজ করার জন্য তিনি রচনা করেন বর্ণ পরিচয়ের প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগ। সংস্কৃত ভাষা শিক্ষাকে সহজ করার জন্য তিনি ব্যাকরণের উপক্রমণিকা রচনা করেন। তাছাড়া তিনি অনেক গ্রন্থের অনুবাদও করেছেন। তার মধ্যে উইলিয়াম শেক্সপিয়রের ‘কমেডি অব এরর’ নাটক অবলম্বনে লিখেন ‘ভ্রান্তিবিলাস’।

শুধু সাহিত্য নয়, শিক্ষা বিস্তারে তার কৃতিত্ব অসাধারণ। সংস্কৃত শিক্ষার সংস্কার, বাংলা শিক্ষার ভিত্তি স্থাপন এবং নারী শিক্ষা প্রসারে অগ্রণী ভূমিকা তার অক্ষয় কীর্তি। তাছাড়া স্কুল পরিদর্শক থাকাকালে গ্রামে-গঞ্জে ২০টি মডেল স্কুল, ৩৫টি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন। তার প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশন। এখন এটি বিদ্যাসাগর কলেজ নামে খ্যাত।

তিনি একজন সফল সমাজ-সংস্কারকও ছিলেন। দেশে প্রচলিত নানা ধরনের কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তিনি রুখে দাঁড়ান। তিনি কন্যা শিশু হত্যা, বহু বিবাহ প্রথার বিরুদ্ধ সংগ্রাম করেন। তিনি হিন্দু সমাজে বিধবা বিবাহের পক্ষে কঠোর অবস্থান নেন। তার নিরলস প্রচেষ্টার কারণে ১৮৫৬ সালে গভর্নর জেনারেলের সম্মতিক্রমে বিধবা বিবাহ আইন পাস হয়।

বিদ্যাসাগর দান-দাক্ষিণ্যের জন্য খ্যাত ছিলেন। এ কারণে তাকে দয়ার সাগরও বলা হতো। যথেষ্ট সচ্ছল না হলেও বহু অনাথ ছাত্র তার বাসায় থেকে লেখাপড়া করতো। কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের চরম অর্থ কষ্টের সময়ে বিদ্যাসাগর তাকে প্রচুর অর্থ সাহায্য করেছেন। কবি নবীনচন্দ্র তরুণ বয়সে বিদ্যাসাগরের অর্থে লেখাপড়া করেছেন।

তার মাতৃভক্তি ছিলো অসাধারণ। মায়ের ইচ্ছায় তিনি গ্রামে দাতব্য চিকিৎসালয় ও বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। মায়ের ডাকে সাড়া দিয়ে তার কাছে যাওয়ার জন্য তিনি একবার ভরা বর্ষায় গভীর রাতে দামোদার নদ পার হয়ে বাড়ি যান। এই সমাজ সেবক মহাজ্ঞানী ১৮৯১ সালের ২৯ জুুলাই সালে ৭১ বছর বয়সে পরলোকগমন করেন।’

একটা চলচ্চিত্র নানান রকম মিউজিক ব্যবহার হতে পারে। ‘বিদ্যাসাগর’ চলচ্চিত্র আমরা দুই ধরনের মিউজিকের ব্যবহার বেশি দেখতে পাই। তার মধ্যে, পারিপার্শ্বিক মিউজক ও প্লেবেক মিউজিক অন্যতম।

মিউজিকের মাধ্যমে একজন পরিচালকের অনুভূতি ও মনোভাব ব্যক্ত করা হয়। মিউজিক চলচ্চিত্রের অ্যাকশনেও নতুন মাত্রা এনে দিতে পারে। তাছাড়া মিউজিক চলচ্চিত্রের স্থান, কাল ও পরিবেশ সম্পর্কে নিঁখুত ধারণা দেয়।

‘বিদ্যাসাগর’ চলচ্চিত্রে এমন একটি গানের ব্যবহার দেখেছি, যেখানে গানটির কথায় চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তু লুকায়িত। গানটি হলো ‘বেঁচে থাকুক বিদ্যাসাগর চিরজীবী হয়ে’। এছাড়াও নানা পার্শ্বিক ও আবহ সংগীতের ব্যবহার খুব বেশি লক্ষ্য করা যায়। ‘বিদ্যাসাগর’ চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনা করেছেন রবীন চট্টোপাধ্যায়।

‘বিদ্যাসাগর’ চলচ্চিত্রে নাম ভূমিকায় কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন পাহাড়ি সান্ন্যাল। ভদ্রলোকের নিঁখুত অভিনয়, পুরো চলচ্চিত্র প্রেমীদের অবাক করে দেয়। বিদ্যাসাগর চরিত্রটি বোধহয় অন্য কেউ করলে অতোটা ফুটিয়ে তুলতে পারতো বলে মনে হয় না। সংলাপ প্রক্ষেপণ থেকে শুরু করে অভিনয়, সবকিছু এতোটাই মনোমুগ্ধকর ছিলো, সত্যি প্রশংসা না করে পারা যায় না। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে যারা ছিলেন, তাঁরা হলেন মলিনা দেবী, ছবি বিশ্বাস, কমল মিত্র, অহীন্দ্র চৌধুরী, গুরুদাস বন্দোপাধ্যায়, অনুপ কুমার, উৎপল দত্ত, জওহর রায়, সন্তোষ সিংহ, রেনুকা রায়, শোভা সেন অন্যতম।

এছাড়াও আরো নাম ভূমিকায় ছিলেন রঞ্জিৎ রায়, শুভেন চক্রবর্তী, অরুনাভ দাশগুপ্ত, হরিধন মুখোপাধ্যায়, জ্যোতির্ময়, গৌতম, পুরু মল্লিক, আদিত্য, হরিমোহন, সন্তোষ দাস, সুখেন্দু দাস, গোকুল/দেবু, অবিনাশ, চন্দ্রশেখর, মনোজ, ম্যালকম, শিবকালী, মধুসূদন, কেষ্ট দাস, গোপাল দে, দেবেন/ বলাই, আদল, উপেন, সুশীল, বটু/ শিবরাম, কালীপদ, গণেশ, রবীন, প্রবীর, অলকা দেবী, মিরিয়ম ষ্টার্ক, নিভাননী দেবী, তারা ভাদুড়ী, সন্ধ্যা দেবী, আশা দেবী, গঙ্গা দেবী ও নিশীথ প্রমথ প্রমূখ খ্যাতনামা অভিনয়শিল্পীবৃন্দ।

ডিলুক্স ফিল্ম ডিস্ট্রিবিউটার্স লিমিটেডের পরিশেবশনায়, এমপি প্রোডাকশন্স লিমিটেড নিবেদিত চলচ্চিত্র ‘বিদ্যাসাগর’। চলচ্চিত্রটির সম্পাদনায় ছিলেন কমল গাঙ্গুলী, শিল্প নির্দেশনায় তারক বসু ও সুধীর খান এবং বিশেষ তত্ত্বাবধানে অগ্রদূত; সর্বশেষ চিত্রনাট্য পরিচালনায় কালী প্রসাদ ঘোষ।

add

আপনার মতামত লিখুন :

2 responses to “ঈশ্বরচন্দ্রের জীবন ও কর্ম ‘বিদ্যাসাগর’ চলচ্চিত্র”

  1. Nurun Nabee Nur says:

    ধন্যবাদ ভাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ