সোমবার, ২৬ জুলাই ২০২১, ০৮:১২ অপরাহ্ন

ঈদ পরবর্তী বিধিনিষেধে কারখানা বন্ধ রাখা হলে করোনা সংক্রমণ দ্রুত বৃদ্ধি পাবে

সৈয়দ নজরুল ইসলাম
  • প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১৫ জুলাই, ২০২১
  • ১০ Time View
সৈয়দ নজরুল ইসলাম

সৈয়দ নজরুল ইসলাম: ২০২০ সালে মার্চ থেকে বৈশ্বিক মহামারী করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের গন্তব্য দেশগুলোর প্রায় সবগুলোতেই আংশিক বা পূর্ণাঙ্গ লকডাউনে থাকায় একে একে ক্রয়াদেশ বাতিল ও স্থগিত হতে থাকে। করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে ২০২০ সালের মার্চ মাস থেকে প্রথম লকডাউনের মধ্যে পোশাক শিল্প কারখানাগুলো ২৬ দিন বন্ধ রাখা হয়। ফলে প্রাপ্ত তথ্য মতে, প্রায় তিন দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি ক্রয়াদেশ বাতিল/স্থগিত হয়। পোশাক শিল্পের মালিকরা শিল্পের ভবিষ্যত ও শ্রমিকদের মজুরী দেয়াসহ অন্য কার্যক্রম পরিচালনা নিয়ে গভীর সংকটে পতিত হলে সরকার কর্তৃক সহজ শর্তে ঋণ দেয়ায় শ্রমিকদের বেতন ও ভাতা পরিশোধে সক্ষম হয়।

লকডাউনের মধ্যেও পোশাক কারখানা খোলা রাখায় রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি বেড়েছে: সরকার কর্তৃক রপ্তানি বাণিজ্যের বিষয়টি সদয় বিবেচনাপূর্বক লকডাউনের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালন সাপেক্ষে পোশাক কারখানা খোলা রাখার অনুমতি দেয়ায় এবং শ্রমিক-মালিকদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা বন্দর, কাস্টমস, ও ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরের সহযোগিতায় পোশাক খাত রপ্তানিতে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। ২০২০-২০২১ অর্থ বছরে গত অর্থ বছরের তুলনায় রপ্তানিতে প্রায় ১৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়নে সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে বর্তমানে বিদেশী ক্রেতা কর্তৃক নতুন নতুন ক্রয়াদেশ উপস্থাপন হচ্ছে। ওই রপ্তানি আদেশগুলো বাস্তবায়নে পোশাক শিল্প মালিকরা সুষ্ঠ পরিকল্পনার ভিত্তিতে বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যেও কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

কারখানা বন্ধ রাখা হলে বিপুল পরিমাণ রপ্তানি আদেশ বাতিল/স্থগিত হবে, নতুন অর্ডার প্রাপ্তি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বে: ঈদ-উল-আযহার পরবর্তী ২৩ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত ১৪ দিন সরকার কর্তৃক ঘোষিত বিধিনিষেধের মধ্যে পোশাক কারখানাগুলো বন্ধ রাখা হলে চলমান রপ্তানি আদেশগুলো ক্রেতার নির্ধারিত লিড টাইমের মধ্যে জাহাজীকরণ করা সম্ভব হবে না। বর্তমানে আমেরিকা ও ইউরোপে করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে, চাহিদা বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে পোশাক বিক্রি বেড়েছে। ফলে যে কোন মূল্যে দ্রুত পণ্য ডেলিভারি চাই। বর্তমান সময়টা ইউরোপ ও আমেরিকাতে আগামী বসন্ত ও গ্রীষ্ম মৌসুমে প্রচুর রপ্তানি আদেশ প্রাপ্ত হচ্ছে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প। এ সময়ে কারখানা বন্ধ রেখে চলমান রপ্তানী আদেশগুলো যথা সময়ে জাহাজীকরণ করতে না পারলে ভবিষ্যতের অর্ডারগুলো গ্রহণ করা সম্ভব হবে না। রপ্তানি বাণিজ্যে বাংলাদেশের প্রতিযোগি দেশগুলো যথাক্রমে- ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ভারত, চীন ও মিয়ানমারে কারখানা খোলা রেখে উৎপাদন পরিচালনা করছে। ফলে ক্রেতার নতুন রপ্তানি আদেশগুলো ওই দেশগুলোতে স্থানান্তরের সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে।

এছাড়াও বৈশ্বিক বিভিন্ন অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে বড় বড় শিপিং কোম্পানিগুলোর ব্যবসায় সংকোচন নীতির কারণে ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দর যথা- সিঙ্গাপুর, কলম্বো, পোর্ট কেলাং ও চায়নার বিভিন্ন বন্দরগুলো কনটেইনার ও জাহাজ জটের প্রেক্ষিতে মাদার ভ্যাসেলে স্পেস (জায়গা) না থাকার কারণে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি পণ্য পাঠাতে বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রাইভেট আইসিডিতে ১৫ হাজারেরও অধিক রপ্তানিবাহী কনটেইনার অপেক্ষমান রয়েছে। নির্দিষ্ট লিড টাইমের মধ্যে পণ্য চালান জাহাজীকরণ নিয়ে রপ্তানিকারকগণ গভীর উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ ও কনটেইনার জটের সৃষ্টি হয়ে আমদানি-রপ্তানি ব্যাহত হবে: ঈদ-উল-আযহা পরবর্তী ২৩ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত বিধিনিষেধের মধ্যে ১৪ দিন পোশাক কারখানাগুলো বন্ধ রাখা হলে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পণ্য চালান ডেলিভারি নেওয়া সম্ভব হবে না, বন্দরে কনটেইনার সংরক্ষণে ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত হয়ে হ্যান্ডলিং কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে বহিঃনোঙ্গরে জাহাজের অবস্থান বৃদ্ধি পেয়ে কনটেইনার ও জাহাজ জটের সৃষ্টি হয়ে বিদেশী ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুন্ন হবে। এছাড়াও সময়মত পণ্য চালান খালাস ও রপ্তানি করতে না পারার কারণে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে মারাত্মক বিপর্যয়ের সৃষ্টি হবে। যা জাতীয় অর্থনীতিতে নৈতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম বন্দরে দৈনিক গড়ে সাড়ে চার হাজার টিইইউজ আমদানি পণ্য চালানের কনটেইনার জাহাজ থেকে খালাস করা হয় এবং গড়ে চার হাজার ৩০০ টিইইউজ রপ্তানি চালানের কনটেইনার জাহাজীকরণ করা হয়। আমদানি পণ্য চালানগুলো ডেলিভারী নেওয়া সম্ভব না হলে ১৪ দিনে ৬৩ হাজার টিউজ কনটেইনার বন্দর জেটিতে মারাত্মক জটের সৃষ্টি করবে। বন্দর জেটিতে কনটেইনার রাখার ধারণ ক্ষমতা ৪৯ হাজার ১৮ টিইইউজ।

শ্রমিকদের মাঝে করোনা সংক্রমণের হার তুলনামূলকভাবে কম: পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশ শ্রমিকের বয়স তুলনামূলকভাবে কম এবং নিয়মিতভাবে পরিশ্রমী হওয়ার কারণে ইমিউনিটি (রোগ প্রতিরোধ) ক্ষমতা বেশি থাকায় এবং পোশাক কারখানাগুলো স্বাস্থ্য বিধি কঠোরভাবে প্রতিপালনপূর্বক কার্যক্রম পরিচালনা করায় করোনা সংক্রমনের হার অনেকটাই কম।

কারখানা বন্ধ রাখা হলে করোনা সংক্রমণের হার দ্রুত বৃদ্ধি পাবে: কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হলে ৩০-৩৫ লাখ শ্রমিক যার মধ্যে ৫০ শতাংশ শ্রমিক উত্তরবঙ্গের অধিবাসী। সবাই গ্রামের বাড়িতে চলে যাবে। বর্তমানে গ্রামাঞ্চলে (বিশেষ করে উত্তরবঙ্গে) সংক্রমণের হার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে পরবর্তী শহরের কারখানাগুলোও সংক্রমণের হার মারাত্মক হারে বৃদ্ধি পাওয়ার আশংকা রয়েছে। উল্লেখ্য, গত ঈদুল ফিতরের সময় সরকারের সীমিত ছুটি প্রদানের সময়োচিত পদক্ষেপের ফলে শ্রমিক-কর্মচারীরা অধিকাংশই নিজ কর্মস্থলে উপস্থিত ছিল। ফলে যাতায়াত সীমিত থাকায় করোনা সংক্রমণ প্রকট হয়নি।

এ বিষয়গুলো সরকার কর্তৃক বিশেষ বিবেচনারপূর্বক বাংলাদেশের রপ্তানি খাতেগুলোর বিপর্যয় এড়ানোর লক্ষ্যে জীবন-জীবিকার স্বার্থে স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালনপূর্বক যথা নিয়মে রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানাগুলো খোলা রাখার নির্দেশনা দেয়া প্রয়োজন। এছাড়াও পোশাক শিল্পের আমদানি-রপ্তানি সংশ্লিষ্ট কাস্টমস, বন্দর ও ব্যাংকসহ অন্য দপ্তরগুলো আংশিকভাবে হলেও খোলা রাখা প্রয়োজন।

লেখক: প্রথম সহ-সভাপতি, বিজিএমইএ

Share This Post

আরও পড়ুন