মঙ্গলবার, ০৫ জুলাই ২০২২, ০২:৫১ অপরাহ্ন

ইউপির সচিবরা আন্তরিক হলে বেগবান হবে গ্রাম আদালতের কার্যক্রম

পরম বাংলাদেশ ডেস্ক
  • প্রকাশ : রবিবার, ২২ মে, ২০২২
  • ৩৬ Time View

চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের উপ-পরিচালক (স্থানীয় সরকার) বদিউল আলম বলেছেন, ‘গ্রাম আদালতের কার্যক্রম চলমান থাকলেও তা সঠিকভাবে তদারকি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্ধারিত ছক অনুযাযী অবহিত না করার কারণে কিছুটা বাঁধাগ্রস্ত হচ্ছে। ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সচিবরা আরো আন্তরিক হলে গ্রাম আদালতের সার্বিক কার্যক্রম বেগবান হবে। বিভিন্ন কারণে মানুষ গ্রাম আদালতের বিচার ব্যবস্থার উপর আস্থা হারাচ্ছে। জন প্রতিনিধিরা কোন এক পক্ষের হয়ে কাজ করেন বলেই বিচার প্রার্থীরা উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হচ্ছেন। বাস্তব পরিস্থিতি দেখে ন্যায় বিচার করলে গ্রাম আদালতে গ্রহণযোগ্যতা আরো বাড়বে।’

রোববার (২২ মে) চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে গ্রাম আদালতের কার্যক্রমের অগ্রগতি ও পরিচালনা দিক-নির্দেশনা প্রদানের লক্ষ্যে ইউপির সচিবদের সাথে অনুষ্ঠিত মত বিনিময় সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীন বাংলাদেশে গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ (দ্বিতীয় পর্যায়) প্রকল্পের সহযোগিতায় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন এ সভার আয়োজন করে।

সভায় সন্ধীপ, সীতাকুণ্ড, ফটিকছড়ি, সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা, ইউএনডিপি প্রতিনিধি, প্রকল্পভূক্ত এলাকার ইউপির সচিবরা অংশ নেন। জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার (স্থানীয় সরকার) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট নূর জাহান আক্তার সাথীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সভায় মাল্টিমিডিয়ার মাধ্যমে গ্রাম আদালত কার্যক্রম বাস্তবায়নে জেলার অগ্রগতি, মাসিক-ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন ও গ্রাম আদালত টেকসইকরণে ইউপির সচিবদের দায়িত্ব সম্পর্কে আলোকপাত করেন ইউএনডিপির এভিসিবি-২ প্রকল্পের ন্যাশনাল কনসালট্যান্ট উজ্জ্বল কুমার দাস চৌধুরী।

বক্তব্য রাখেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শাহাদাত হোসেন (সীতাকুন্ডু), মো. সাব্বির রাহমান সানি (ফটিকছড়ি), ফাতেমা-তুজ জোহরা (সাতকানিয়া) ও মো. শরীফ উল্যাহ (লোহাগাড়া)।

সভায় জানানো হয়, দেশের আনুষ্ঠানিক বিচার ব্যবস্থার উপর চাপ কমাতে এবং দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠির সহজে, কম খরচে, স্বল্প সময়ে, সঠিক বিচার প্রাপ্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ১৯৭৬ সালে গ্রাম আদালত অধ্যাদেশ প্রণয়নের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে বিরোধ নিষ্পত্তির পদ্ধতিকে আরো ফলপ্রসূ করার জন্য আইনী কাঠামোর মধ্যে আনা হয়। কিছু সংশোধনীসহ ২০০৬ সালে অধ্যাদেশটিকে আইনে পরিণত করা হয়, ২০১৩ সালে আইনের কিছু ধারা সংশোধন করা হয় ও সর্ব শেষ ২০১৬ সালে গ্রাম আদালত বিধিমালা প্রণীত হয়।

বিভিন্ন ধরনের সীমাবদ্ধতার কারণে দীর্ঘ সময় পার হলেও এখনো সব ইউনিয়ন পরিষদে সমানভাবে গ্রাম আদালত আইন যথাযথভাবে কার্যকর না হওয়ায় অর্থাৎ গ্রাম আদালত সক্রিয় না হওয়ায় সরকারকে আইনটি কার্যকর করার মাধ্যমে গ্রাম আদালতের বিচার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার জন্য প্রকল্প নিতে হয়। প্রথম পর্যায়ে ২০০৯-২০১৫ মেয়াদে ৩৫১টি ইউনিয়নে গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়। ওই প্রকল্পের শিক্ষা, অভিজ্ঞতা ও সাফল্যকে সামনে রেখে পরবর্তী ২০১৬-২০২২ মেয়াদে আটটি বিভাগের ২৭টি জেলার ১ হাজার ৮০টি ইউনিয়নে ‘বাংলাদেশে গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ (দ্বিতীয় পর্যায়) প্রকল্প’ নেয়া হয়, যা এ জেলায় পাঁটি (সীতাকুন্ড, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, ফটিকছড়ি ও সসন্দ্বীপ) উপজেলার ৪৬টি ইউনিয়নে প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে।

সভায় আরো জানানো হয়, বিভিন্ন কারণে দেশে বিচারিক আদালতে মামলার বিরাট জট তৈরি হয়েছে, যদি দেশে গ্রাম আদালত কার্যক্রম সক্রিয় করা সম্ভব হয়, তবে মামলার জট নিরসনের পাশাপাশি অল্প সময়ে, স্বল্প খরচে সাধারণ মানুষজন বিচারিক সেবা পাবেন, এতে করে সমাজে শান্তি শৃংখলা বজায় থাকবে ও মানুষ অর্থনৈতিক ক্ষতির হাত থেকে রেহাই পাবে।

প্রকল্পের আওতায় প্রকল্পভুক্ত ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে গ্রাম আদালত পরিচালনায় সহযোগিতা ও নথিপত্র ব্যবস্থাপনার জন্য বেসরকারী সংস্থার মাধ্যমে গ্রাম আদালত সহকারী নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, বিচার প্রার্থীদের সাথে কাউন্সেলিং, মামলা নেয়া থেকে শুরু করে বিচারিক কাজের প্রতিটি স্তরে ইউপির চেয়ারম্যান বা গ্রাম আদালতকে সহযোগিতা, গ্রাম আদালতের নথি তৈরি ও সংরক্ষণ, গ্রাম আদালতের মামলার প্রতিবেদন তৈরি প্রভৃতি ক্ষেত্রে গ্রাম আদালত সহকারীদের ভূমিকার ফলে প্রকল্পভুক্ত এলাকায় গ্রাম আদালত উল্লেখযোগ্যভাবে সক্রিয় হয়।

স্থানীয় সরকার বিভাগ ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ইউনিটের সিদ্ধান্ত অনুসারে, গ্রাম আদালতের পেশকারের দায়িত্ব ও গ্রাম আদালদের নথি ও রেজিস্টার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব হিসাব সহকারী-কাম-কম্পিউটার অপরেটরদের/ইউপির সচিবদের কাছে ২০২১ এর ফেব্রুয়ারিতে হস্তান্তর করা হয়েছে। সেই থেকে ইউপির সচিবরা গ্রাম আদালতের পেশকারের দায়িত্ব ও গ্রাম আদালদের নথি ও রেজিস্টার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

ইতিমধ্যে প্রকল্প থেকে সবাইকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন সময় গ্রাম আদালত বিষয়ে ওরিয়েন্টেশন/দিক-নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

সভায় আরো জানানো হয়, জেলার বর্তমান গ্রাম আদালতের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য অবশ্যই ইউপির চেয়ারম্যান, ইউপির সচিবদের মধ্যে সুসমন্বয় গড়ে তোলা ও যার যার অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে হবে। একই সাথে গ্রাম আদালতের মাসিক ও ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন প্রস্তুত করে নিয়মিত উপজেলা ও জেলায় পাঠাতে হবে। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও ইতিমধ্যে যে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জিত হয়েছে, তা পরবর্তী গ্রাম আদালত পরিচালনা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তাছাড়া, গ্রাম আদালতের সক্রিয়তা ও গ্রাম আদালতের বিচারিক মান উত্তরোত্তর বৃদ্ধির জন্যে উপজেলা প্রশাসন ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মনিটরিং কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। এ বিষয়ে সকলকে সরকারের নির্দেশনাগুলো যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে। উপজেলা নির্বাহী অফিসাররা নিয়মিত মনিটরিংয়ের অংশ হিসাবে গ্রাম আদালত কার্যক্রম আলাদাভাবে গুরুত্ব দিয়ে মনিটরিং করবেন। জেলার সব চেয়ারম্যান যাতে ইউপি সচিবদেরকে সার্বিক সহযোগিতা করে, তার জন্য উপজেলা নির্বাহী অফিসাররা প্রযোজনীয় নির্দেশনা প্রদানসহ ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

সংশ্লিষ্টদের আন্তরিকতা ও পরিশ্রমের কারণে সারা দেশের মধ্যে আমরা গ্রাম আদালত কার্যক্রমে এ জেলা ভাল অবস্থানে রয়েছে। গ্রাম আদালতকে যথাযথভাবে কার্যকর করার মধ্যে দিয়ে দেশের দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের বিশেষতঃ নারী ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠির ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সরকারের অঙ্গীকার পূরণে সহায়তা করার জন্য সভায় উপস্থিত সকলকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সক্রিয় ও ইতিবাচক ভূমিকা পালনের আহবান জানানো হয়।

পবা/এমএ

Share This Post

আরও পড়ুন