শিরোনাম
সোমবার, ১২ এপ্রিল ২০২১, ১২:৩৭ অপরাহ্ন

আমির সওদাগর ও ভেলুয়া সুন্দরীর অমর প্রেমের সাক্ষী চট্টগ্রাম ভেলুয়ার দীঘি

আলীউর রহমান রোশাই / ১৬৫ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে
প্রকাশের সময় : শুক্রবার, ১২ ফেব্রুয়ারী, ২০২১

১৫১৯ থেকে ১৫৩২ সালের ঘটনা। তখন চট্টগ্রামে স্বাধীন সুলতান নসরত শাহের শাসন চলছিল। যমুনা তীরের ধনী সওদাগর আমির সাধুর সুন্দরী বধু ভেলুয়াকে চুরি করে কাট্টলীর ভোলা সওদাগর। সাগর নদী পাড়ি দিয়ে বর্তমান ভেলুয়া দীঘির স্থলে ভোলা সওদাগরের বাড়িতে আবিস্কার করে ভেলুয়াকে। যুদ্ধ করে আমির সওদাগর ভেলুয়াকে উদ্ধার করে। তত দিনে স্বামী শোকে মৃত্যু প্রায় ভেলুয়া। স্বামীর কোলে মাথা রেখে চিরবিদায় নেয়। সেই শোকে ভোলাকে খুন করে তার ভিটাতে অমর প্রেমের স্বারক হিসেবে বাদশা নসরত শাহ ভেলুয়া দীঘি খননের নির্দেশ নেয়। সেই দিঘী এখন দখল দুষণের কবলে। আসুন সবাই মিলে পাহাড়তলী রেলওয়ে স্টেশন সংলগ্ন ভেলুয়া দীঘি উদ্ধার ও সংস্কারে সক্রিয় হই।

আমির সওদাগর ভেলুয়া সুন্দরীর পুরো কাহিনী না পড়লে চট্টগ্রামের কিংবদন্তি সম্পর্কে জানবেন কি করে?

আমির সওদাগর ও ভেলুয়ার অমর প্রেম কাহিনীর স্বারক পাহাড়তলী ভেলুয়া সুন্দরীর দীঘি

চট্টগ্রাম মহানগরীর পাহাড়তলী রেলওয়ে স্টেশন সংলগ্ন ভেলুয়ার সুন্দরীর দীঘি ভেলুয়ার দীঘি নামে সমধিক পরিচিত। গবেষক আবদুল হক চৌধুরীর মতে, ভেলুয়া সুন্দরী দীঘি খনন গৌড়ের সুলতান সৈয়দ নাসিরুদ্দিন নশরত শাহ অনন্য র্কীতি। সুলতান নশরত শাহর (১৫১৯-১৫৩২) রাজত্বকালে বাংলার স্বাধীন সুলতানী আমলের স্বর্ণ যুগ বলা হয়ে থাকে। তিনি ১৫২৫ খ্রিষ্টাব্দে উত্তর চট্টগ্রামসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামের শঙ্খ নদীর তীর অবধি ভূভাগটি জয় করেন এবং চট্টগ্রাম শহরের আটমাইল উত্তরে হাটহাজারী থানার ফতেয়াবাদে রাজধানী স্থাপন করেন। রাজধানীর নামানুসারে চট্টগ্রামের নতুন নামকরণ করেছিলেন ফতেয়াবাদ। নসরত শাহর চট্টগ্রাম শাসনকালে (১৫২৫-১৫৩২) কাট্টলীর ভোলা সওদাগর শাফলা বন্দর থেকে ভেলুয়াকে অপহরণ করে তার বাড়িতে নিয়ে আসে। পরবর্তী ভেলুয়ার স্বামী আমির সাধুর সাথে ভোলা সওদাগরের যুদ্ধ হয়। যুদ্ধ চলাকালে বিষয়টি সুলতান নশরত শাহের দৃষ্টিগোচর হয়। তিনি বিচার করে ভেলুয়াকে আমির সাধুর নিকট ফেরত দেন এবং অপহরণকারী ভোলা সওদাগরের সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে গরীবদের মাঝে বিলিয়ে দেন এবং তার ভিটে বাড়িতে ভেলুয়ার দিঘি খনন করান বলে গবেষক আবদুল হক চৌধুরী উল্লেখ করেছেন।

তবে দিনেশচন্দ্র সেন সংগৃহিত ‘ভেলুয়া’ পালায় যুদ্ধ জয়ের পরে ভোলা সওদাগরকে হত্যা করে আমির সাধু। তার নির্দেশে আমির সাধু যোদ্ধারা ভেলুয়া দীঘি খনন করে বলে উল্লেখ রয়েছে।

এ দিকে দীর্ঘ দিন অপহরণকারী ভোলা সওদাগরের কবলে থেকে সতী ভেলুয়া মারাত্মক রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েছিল। আমির সওদাগর উদ্ধার করে শাফলা বন্দরে নেয়ার পূর্বে ডিঙাতে তার মৃত্যু হয়। শাফলা বন্দর সংলগ্ন সাগর তীরেই ভেলুয়াকে সমাহিত করা হয়।

পনের শতকে সংঘটিত আমির সওদাগর ও ভেলুয়া সুন্দরীর বিয়োগান্ত প্রণয় উপাখ্যান সমগ্র চট্টগ্রাম অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল। তখনকার চারণ কবিরা চমৎকার এ কাহিনীকে পালাগান আকারে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে গেয়ে বেড়াতে থাকে। বিবিসি নির্ণয়কৃত হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী শ্রী দীনেশচন্দ্র সেন আটার শতকের শেষ দিকে সিলেট থেকে পালাগানটি সংগ্রহ করেন।
সতী সুন্দরী গৃহবধু ভেলুয়া ও আমির সওদাগরের বিয়োগান্ত কাহিনীর সার সংক্ষেপ বর্ণনার চেষ্টা করা হলো।

তৎকালে যমুনা নদীর তীরে শাফলা নামে এক বন্দর ছিল, যাার মালিক মাণিক সওদাগর। বন্দরের অদূরে নদীর তীরে তার ভবন। মালামাল আর ধন দৌলতে তার ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান পূর্ণ ছিল। তার একমাত্র পুত্র আমির সাধু। সুঠাম দেহের অধিকারী ছিলেন আমির সাধু। ষোল বছর বয়সেই আমির সাধুর শিক্ষা-দিক্ষার সুনাম দেশ দেশান্তরে ছড়িয়ে পড়েছিল।

এক ফাগুনে ষোল বছরের যুবক আমির সাধু তার মায়ের কাছে শিকারে যাওয়ার বাসনা করে। আমিরের মা একমাত্র পুত্রকে সাগরে যেতে নিষেধ করলেও পিতা মাণিক সওদাগর আমিরকে শিকারে নিয়ে যেতে দক্ষ মাঝি গৌরলধরকে নির্দেশ দিল। সাত পাল খাটানো ‘কালাধর’ ডিঙা ভাসিয়ে শিকারে যাত্রা করলো আমির সাধু। নদী পার হয়ে সাগর পথে অভিজ্ঞ গৌরলধর মাঝি উপকূলের পাশ দিয়ে ডিঙা চালাতে লাগলো। যুবক আমির সাধু তীরের কাছাকাছি নয়, গভীর সাগর দিয়ে ডিঙা চালাতে বললে মাঝি তার পিতার নির্দেশের কথা স্বরণ করিয়ে দিল। মাঝির কথা না শুনে নিজেই হাল ধরে ডিঙা মাঝ সাগরের দিকে ঘুরিয়ে দিল। ফাগুন মাসের উত্তাল বাতাসে গতিপথ হারালো ডিঙা। উজান ভাটি না বুঝে ডিঙা এগিয়ে চলল সাগরের উত্তাল ঢেউয়ে। পর দিন কুলের দেখা পেয়ে ডিঙা ভিড়াতে নির্দেশ দিল আমির সাধু।

দেয়াঙ পাহাড়ে শিকারে গেল আমির সাধু ও তার দল। জঙ্গলে ঢুকতেই এক সুন্দর কবুতর দেখতে পেল শিকারীর দল। পিছু নিয়ে অনেক কষ্টে তীরের আঘাত করলো কবুতরের বুকে। আহত কবুতর উড়ে গিয়ে পাহাড়ের পাশ্ববর্তী এক টঙ ঘরে বসা ভেলুয়ার কোলে গিয়ে পড়লো। তার প্রিয় হিরনি কবুতর আহত দেখে টঙ ঘর থেকে বের হয়ে কেঁদে উঠলো ভেলুয়া।

ভেলুয়ার সুখের জন্য সাত ভাই সাগর তীর ঘেষা দেয়াঙের পাহাড়ের পাদদেশে আশীগজা টঙ ঘর বেধে দিয়েছে। সেই ঘরে বসে সাগরের ঢৈউ দেখছিল ভেলুয়া, আহত কবুতর দেখে কেদে উঠলো সে। তার কান্না শুনে পাশে অবস্থানকারী সখিরা ছুটে এলো। ভেলুয়ার হিরনী কবুতর হত্যার দায়ে আমির সাধুকে সাগরের ডিঙা থেকে আটক করলো ভেলুয়ার সাত ভাই। আটক আমিরকে ঘরে দিয়ে বুকে পাথর চাপা দিয়ে বেধে রাখলো। বন্দী আমির তার মাকে স্বরণ করে বিলাপ করার সময় সে কথা শুনতে পেল ভেলুয়ার মা মনাই সোন্দরী। তিনি বন্দী আমিরের কাছে গিয়ে তার পরিচয় জানতো চাইল। আমিরের মা বাবার নাম শুনতেই কেঁদে উঠলো মনাই সোন্দরী। সে তার সাত পুত্রকে ডেকে বললো বন্দী যুবক আমির তার বোন মোনাই সোন্দরীর একমাত্র পুত্র। তার বোনকে মানিকধন সওদাগরের কাছে বিয়ে দিয়েছিল তার পুত্র আমির। ভেলুয়ার মা পুত্রদের আরো বলেন, তিনি বোনের কাছে ওয়াদা করেছিলেন তার মেয়ে হলে বোন পুত্রের সাথে বিয়ে দিবেন। আল্লাহ সেই ওয়াদা পূরণের সুযোগ করে দিতেই আমিরকে তাদের কাছে পাঠিয়েছেন। মায়ের ওয়াদা অনুযায়ী মহা ধুমধামে আমির সাধু ভেলুয়ার বিয়ে হলো। আমির ডিঙায় করে ভেলুয়াকে শাফলা বন্দরে নিয়ে এলো।

আমিরের এক বোন ছিল তার নাম বিভলা। সে খুবই রূঢ় প্রকৃতির এবং ঝগড়াটে ছিল। ভেলুয়ার রূপ-গুনে আমিরের পুরো পরিবার খুশী হলেও বিভলা তা মেনে নিতে পারেনি। সে সুযোগ পেলেই ভেলুয়াকে অপমান করতো। আমির ভেলুয়ার বিয়ের দুই বছর পর তার ভাই বউ পাগল, অকর্মন্য ইত্যাদি বদনাম ছড়াতে লাগলো। সে বিভিন্ন কুমন্ত্রণা দিয়ে আমিরের মাকেও ছেলেকে বাণিজ্যে পাঠানোর জন্য প্ররোচনা দিল। মায়ের মতোভাব বুঝতে পেরে আমির মাঘ মাসে শীতের মৌসুমে বাণিজ্যে যাত্রা দিল। গৌরলধর মাঝি ডিঙা নিয়ে সাগর অতিক্রম কালে সন্ধ্যার ঘন কুয়াশায় দিশা হারালো। দুই দিন পর রাত্রি বেলা তীরে এসে দেখলো পথ হারিয়ে তার পুনঃরায় শাফলা বন্দরে ফিরে এসেছে। রাতে আমির ভেলুয়ার ঘরে গিয়ে ঘুমালো। ভোরে কেউ না জেগে উঠার আগেই সবার অজান্তে আবার বাণিজ্যে যাত্রা করলো। সকালে ভেলুয়ার ননদ বিভলা এলোকেশে ঘুমন্ত ভেলুয়াকে দেখলো। রাত্রি জাগরণে ক্লান্ত ভেলুয়াকে ঘুমে রেখেই সাগর পাড়ি দিয়েছে আমির। সকালে দরজা খোলা দেখে ভেলুয়াকে অসতি বলে অপবাদ দিলো বিভলা। সেই কথা পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়লো। বিভলা ভেলুয়াকে অর্ধেক মাটিতে পুতে পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা করার কথা বললো। আমিরের মা ভেলুয়াকে শাস্তি স্বরূপ দাসি করে রাখলো। দিন রাত কাজ করতে গিয়ে ধনীর দুলালী ভেলুয়ার দুঃখের সীমা রইল না।
এক দিন দুপুরে ভেলুয়া শাফলা বন্দর ঘাটে জল আনতে যায়। তখন চট্টগ্রামের কাট্টলীর ভোলা সওদাগর মাছিলি বন্দর থেকে বাণিজ্য করে দেশে ফেরার পথে শাফলা বন্দরে নোঙর করে। ডিঙায় বসে ভোলা নদী থেকে জল নিতে আসা ভেলুয়াকে দেখে তার রূপে মুগ্ধ হয়। ঘাট থেকে ভেলুয়াকে লুটে নিয়ে কাট্টলী যাত্রা করলো ভোলা সওদাগর। রাতে ডিঙায় একাকী ভেলুয়ার কাছে গিয়ে তার প্রণয় প্রার্থনা করে ভোলা। ভেলুয়া কৌশলে ভোলাকে বুঝালো পর পুরুষ হয়ে তাকে ছোয়া উচিত নয়। বিয়ের পর সব হবে।
এ দিকে উজানের মাঝিলি বন্দরে বাণিজ্য করতে গিয়েছিল আমির। বাণিজ্যে তার ব্যাপক লাভ হয়। একদিন ভেলুয়ার কথা খুব মনে পড়লো আমিরের। সাথে সাথে ডিঙা সাজাতে আদেশ দিল গৌরলধর মাঝিকে। ভেলুয়াকে লুট করার তিন দিন পর আমির সাধু বাণিজ্য করে দেশে ফিরে আসলো। ঘরে এসে বাবা-মার কদমবুসি করার সময়ই বোন বিভলা বলল, তিন দিন আগে ভেলুয়ার মৃত্যু হয়েছে। পত্নি শোকে কাতর আমির ভেলুয়ার কবর দেখতে চায়। বিভলা ঘরের অদূরে একটি নতুন কবর দেখিয়ে সেটা ভেলুয়ার কবর বললো। সেই কবর খুড়ে আমির একটি মরা কালা কুকুরের লাশ দেখতে পেল।

পালাকারের বর্ণনায় দেখা যায়, আমির সাধ সাগর পাড়ি দিয়ে শাফলা বন্দর থেকে সাগরের উপকূল বর্তমানে কক্সবাজার জেলার চকরিয়ায় আসে। সেখানে থেকে চন্দনাইশের চিরমাই গ্রামে যান। চিরমাইয়ে একাধিক সাধু দরবেশের মাজার রয়েছে। সেখান থেকে তিনি শঙ্ক পার হয়ে কাইচ্যা (কর্ণফুলীর প্রাচীন নাম) তীরে বোয়ালখালীর কুড়াল্যা মুড়ায় আসেন। সেখানে আমির কর্ণফুলীতে ঝাঁপ দেন। কর্ণফুলীতে তখন তৃতীয় তিথির ভরা জোয়ার ছিল। জোয়ারের স্রোতে আমিরকে ভাসিয়ে কুড়াইল্ল্যা মুরার তিন মাইল উজানে কাউখালী পাক (বর্তমান রাঙ্গুনিয়া গোচারা বাজারের অদূরে বাচা বাবার দরগাহর সামনে) নিয়ে আসে। সেখান থেকে আমির সাধু আরো উজানের রাঙ্গুনিয়ার ইছামতি নদীর তীরে আসে। ইছামতির তীরে উঠে আমির সৈয়দ নগর (বর্তমানে উত্তর রাঙ্গুনিয়া ধামাইর হাট সংলগ্ন) এসে টোনাবারই নামে এক সাধুর শিষ্যত্ব গ্রহন করলো। টোনাবারই দক্ষ্য সারিন্দা বাদক ছিলেন। তিনি আমিরের জন্য বালাম গাছ ও দাঁড় শাপের রগ দিয়ে একটি সারিন্দা বানিয়ে দিলেন। সেই সারিন্দায় যোগ করলো সাদা গোড়ার লেজের চুল ও নোয়াসা গাছের আটা। সারিন্দা বাজানো শিখে আমির গুরুর শিষ্যত্ব গ্রহণ করে দেশান্তরী হলো। সারিন্দায় দিন রাত ভেলুয়া ভেলুয়া সুর বাজিয়ে পশ্চিম দিকে যাত্রা দিল। রাঙ্গুনিয়া ফেলে সে ফতেয়াবাদ (বর্তমানে হাটহাজারী উপজেলার একটি ইউনিয়ন তখন বাদশাহ নশরত শাহের রাজধানী) এলো। ফতেয়াবাদে কিছু দিন ঘুরে সে পশ্চিমের খুলশীর ঢালা (বর্তমান খুলশী) পার হয়ে কাট্টলী গ্রামে গেল। তখন সমুদ্র তীরের কাট্টলী সমৃদ্ধ নগর ছিল।

কাট্টলী নগরে গিয়ে আমির সারিন্দায় ভেলুয়া ভেলুয়া সুর তুলে গ্রামের পর গ্রাম ঘুরে বেড়াতে লাগল। এ দিকে ভেলুয়াকে ভোলার ঘরে আনার ছয় মাস অতিক্রান্ত হয়। সকালে ভোলা সওদাগর ভেলুয়াকে বিয়ের জন্য তৈরি হওয়ার কথা বলে। এমন সময় ভোলার বাড়ির আঙিনায় একজন ফকির এলো। তার সারিন্দায় ভেলুয়া ভেলুয়া সুর বাজতে থাকলো। সারিন্দার সুর ভেলুয়ার কানে গেল। সে উতলা হয়ে বাড়ির ছাদে উঠে ফকিরকে দেখলো। জটা চুল, ছেড়া বসনের ফকির আমিরকে প্রথমে চিনতে পারেনি ভেলুয়া। একটু নজর করে দেখতেই তার অন্তর কেঁদে উঠলো। আমিরকে চিনতে পেরে আগামী দুই এক দিনের মধ্যে ভোলাকে বিয়ে করবে বলে প্ররোচনা দিল ভেলুয়া। সেই সাথে ভোলার কাছে আবদার করলো সারিন্দা ওয়ালা ফকিরকে তার ঘরে থাকতে দিতে। ভেলুয়ার অনুরোধে ভোলা তার কাছারি ঘরে থাকতে দিল আমিরকে। গভীর রাতে ভেলুয়া গোপনে আমিরের ঘরে গিয়ে তার সাথে সাক্ষাৎ করলো। ভেলুয়া বিভলার ষড়যন্ত্র এবং ভোলা সওদাগর তাকে লুঠে আনার কাহিনী আমিরকে বললো।

কাট্টলী নগরের বিচারক ছিলেন মুনাফ কাজী। পর দিন সকালে আমির মুনাফ কাজী নিকট তার স্ত্রী ভেলুয়াকে লুঠ করে ঘরে আটক করে রাখার বিচার প্রার্থনা করলো। আমিরের প্রার্থনা শুনে ভোলাকে ধরে আনতে তার পাইক পেয়াদাকে নির্দেশ দিল। ভোলা সওদাগর বললো ফকির মিথ্যা বলছে। লম্পট ফকির সারিন্দা বাজায় পরের ঘরে সুন্দরী কন্যা দেখলে তাতে লোভ করে। ভোলার প্রতিউত্তরে আমির ভেলুয়াকে ডেকে প্রকৃত ঘটনা জানতে মুনাফ কাজীকে অনুরোধ করলো। কাজী লোক পাঠিয়ে ভোলার ঘর থেকে ভেলুয়াকে তার বিচারের এজলাসে হাজির করলো। ভেলুয়া আমিরকে তার স্বামী স্বীকার করে ভোলা প্রকৃত ঘটনা বললো। বৃদ্ধ মুনাফ কাজীর বয়স আশি বছর। যৌবনে সে লম্পট প্রকৃতির ছিল। বৃদ্ধ হলেও সে স্বভাব যায়নি। অপূর্ব সুন্দরী ভেলুয়ার রূপ থেকে সে মোহিত হলো। ভোলা সওদাগরকে তিরস্কার করে তাড়িয়ে দিল কাজী। আমিরকে বললো, তুমি ফকির মানুষ। গরীব। এতো সুন্দরী স্ত্রী নিয়ে পথে বের হলে আবারও লুট হয়ে যাবে। তোমার সুন্দরী স্ত্রীকে লুট করার বিচার বার বার কে করবে? তার চেয়ে ভেলুয়া তার কাছেই থাকুক। সোনার পালঙ্কে রাজকীয় হালে থাকবে সে। আমির ভেলুয়াকে পাওয়ার আকৃতি করলে কাজী পাইক পেয়াদা তাকে ধাক্কাইয়া এজলাস থেকে বের করে দিল।
খুঁজে পেয়ে ভেলুয়া হারানো শোকে কাতর আমির দ্রুত শাফলা বন্দর গেল। তার বাবা মানিক সওদাগরকে সব কথা খুলে বললো। পুত্র ও পুত্র বধুর এমন পরিণতি দেখে ক্রোদে জ্বলে উঠল মানিক সওদাগর। দৌদ্দটি ডিঙায় কোতোয়াল লাঠিয়াল নিয়ে কাট্টলী নগর ধ্বংস করারত গৌরলধর মাঝিকে নির্দেশ দিল।

আমির সাধুর চৌদ্দ ডিঙা কাট্টলী সাগর তীরে এসে কামানের গোলা মারল। আমির সাধুর আক্রমনের কথা শুনে মুনাফ কাজী দ্রুত ভোলার ঘরে নিয়ে গেল ভেলুয়াকে। ভোলাকে বলল, ভেলুয়া ভোলার শোকে কাতর। ভেলুয়াকে ঘরে পেয়ে ভোলা আবারও বিয়ের স্বপ্নে বিভোর হলো। ততক্ষণে আমির সওদাগরের যোদ্ধারা কাট্টলী নগরে ঢুকে ভোলার বাড়ির দিকে এগিয়ে আসছিল। আক্রমণের সংবাদ ভোলা সওদাগর জানতে পেরে সেও তার লাঠিয়াল করকন্দাজকে সাজতে বললো। এদিকে আক্রমণ থেকে বাঁচতে মুনাফ কাজীও তার লাঠিয়াল কোতোয়াল নিয়ে আক্রমণ করলো। সাত দিন সাত রাত যুদ্ধ শেষে ভোলা ও মুনাফ কাজীর লোকজন পালিয়ে গেল। ভোলার শিরচ্ছেদ করলো আমিরের যোদ্ধা। আটক করলো মুনাফ কাজীকে। যুদ্ধ শেষে আমির সাধু ভোলার ভিটে বাড়িতে দিঘী খননের নির্দেশ দিল। পালাকারের ভাষায়- লাঠিয়াল আর সৈন্য সবে ডাকি সাধু বলে।
ভোলা ও মুনাফ কাজীর ঘরে শোকে অনাহারে রোগাক্রান্ত হয়ে মুমুর্ষ হয়ে পড়েছিল ভেলুয়া। আমির সওদাগর তাকে নিয়ে শাফলা বন্দরে পৌছানোর পূর্বের ডিঙায় তার মৃত্যু হয়। শাফলা বন্দরের সাগর তীরে ভেলুয়াকে সমাহিত করা হয়।

লেখক: সাংবাদিক ও পরিবেশ কর্মী

add

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ