মঙ্গলবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৫:২০ পূর্বাহ্ন

আত্মহত্যা প্রতিরোধে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানসিক স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে হবে

মোস্তফা কামাল যাত্রা
  • প্রকাশ : শুক্রবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২১
  • ২৬০ Time View
মোস্তফা কামাল যাত্রা

মোস্তফা কামাল যাত্রা: ২০২০ সালের ১০ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী একযোগে পালিত হয়েছে বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু), ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন ফর মেন্টাল হেলথ তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিশ্বের দেশে দেশে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে প্রতি বছর এ দিবস উদ্যাপনের মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং মনোসামাজিক স্বাস্থ্য সেবা গ্রহণের গুরুত্ব নিয়ে প্রচারণা চালিয়ে থাকে। যাতে করে রাষ্ট্রীয়ভাবে মানসিক স্বাস্থ্য সেবা খাতকে উন্নত ও মানসম্মত করতে সরকারের মনোযোগ তথা দৃষ্টি আকর্ষিত হয়।

বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় দিবসটির একটি প্রতিপাদ্য নির্ধারিত হয়ে থাকে। সেই প্রতিপাদ্যের আলোকে রাষ্ট্র, মনোসামাজিক স্বাস্থ্য সবা নিয়ে কর্মরত প্রতিষ্ঠান এবং মনোবিজ্ঞানের বিদ্যায়তনিক শিক্ষালয়গুলো প্রাসঙ্গিক আয়োজনের মাধ্যমে দেশজ পরিস্থিতি পর্যালোচনা ও মূল্যায়ন করে থাকে। সেই সাথে প্রতিপাদ্য সংশ্লিষ্ট অবস্থা ও অবস্থানে ইতিবাচক পরিবর্তন নিশ্চিতকরণে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের পদক্ষেপ গ্রহণে উদ্যোগী হতে উৎসাহিত করা হয়ে থাকে এ দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনের মাধ্যমে।

এ বছরের প্রতিপাদ্য নির্ধারিত ছিল ‘আত্মহত্যা প্রতিরোধে মানসিক স্বাস্থ্য সেবা।’ অর্থ্যাৎ বিশ্বব্যাপী বর্তমানে মানসিক অসুস্থতাজনিত কারণে আত্মহত্যার পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রাপ্ত এ বৈশ্বিক পরিসংখ্যান বিবেচনায় এ প্রতিপাদ্য ঘোষিত হয়েছে। যাতে বিশ্বব্যাপী আত্মহত্যা প্রতিরোধে একযোগে কাজ করার উদ্যোগ গ্রহণে দেশীয় পরিপ্রেক্ষিত অনুযায়ী পরিকল্পনা প্রনয়ণ হয়। বাংলাদেশেও রাষ্ট্রীয়ভাবে আত্মহত্যায় নিরুৎসাহিত করতে নানামূখি কর্মসূচি গ্রহণ করার প্রত্যয়ে এ উদ্যোগ গৃহীত হয়েছিল।

আত্মহত্যার নেপথ্য কারণ হচ্ছে আত্মহত্যা প্রচেষ্টাকারী ব্যক্তির নানা ধরনের মানসিক সমস্যায় ভোগা। গবেষনায় দেখা গেছে, আত্মহত্যাকারী ব্যক্তি জীবনের কোন না কোন সময়ে মনোরোগের ভুক্তভোগী ছিল। যথাযথ সময়ে মনোবিজ্ঞানধর্মী সেবা না পাওয়ায় আত্মহত্যার মত নেতিবাচক কর্মে উৎসাহিত হয়েছিল। তাই আত্মহত্যা নিরুৎসাহিত করতে মানসিক বিপস্থগ্রস্থ ব্যক্তিকে মানসিক স্বাস্থ্য সেবার আওতায় আনা জরুরী। এ ক্ষেত্রে পরিবারের ভুমিকা একান্তভাবে কাম্য। কারণ মানসিকভাবে বিপর্যস্থ ব্যক্তি মানসিক সেবা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা তথা গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারে না।

এ পর্যায়ে আমরা দৃষ্টি দিতে চাই, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মানবিক বিপর্যয়ের শিকার বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলায় আশ্রয় নেওয়া মায়ানমারের নাগরিক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি এবং তাদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা প্রসঙ্গে। মায়ানমারের জাতিগত নিধনের শিকার হয়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতিত অবস্থায় জীবন রক্ষায় পালিয়ে বাংলাদেশে আসতে বাধ্য হওয়া প্রায় দশ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে কার্যত কোন জরিপ বা গবেষণা অদ্যাবধি সম্পন্ন হয়নি। যদিও ৩২টি ক্যাম্পে সরকারী ও বেসরকারী পর্যায়ে নানা ধরনের মনোসামাজিক স্বাস্থ্য সেবা দেয়া হচ্ছে। রোহিঙ্গাদের মনোবৈজ্ঞানিক স্বাস্থ্য সেবা কার্যক্রমকে সমন্বয় এবং দক্ষ মনোসামাজিক স্বাস্থ্য সেবা প্রদান কর্মী গড়ে তুলতে অপরাপর সেক্টরের মত মেন্টাল হেলথ অ্যান্ড সাইকোসোস্যাল সাপোর্ট সার্ভিস নামে একটি সেক্টর গঠন করে নিয়মিত মত বিনিময় সভাসহ নানা ধরণের প্রশিক্ষণ অয়োজন করে যাচ্ছে। যাতে করে মাঠ পর্যায়ে রোহিঙ্গাদের জন্য কর্মরত প্রতিষ্ঠানের কর্মী ও কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণে প্রশিক্ষিত মনোসামাজিক কর্মী দ্বারা ক্ষতিগ্রস্থ বা মানসিকভাবে বিপর্যস্থ রোহিঙ্গাদের মানসিক বিপর্যয়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা দেয়া যায়।

জানা মতে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজী বিভাগ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষকদের নেতৃত্বে আলোচ্য দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ পরিচালিত হচ্ছে। ইতিমধ্যে স্বেচ্ছাসেবী উন্নয়ন সংস্থা ইউনাইট্ থিয়েটার ফর সোসাল অ্যাক্শনের (উৎস) তত্বাবধানে বেশকিছু এনজিও/আইএনজিও কর্মকর্তাদের মনোসামাজিক স্বাস্থ্য সেবায় ‘থিয়েটার থেরাপির ব্যবহার’ শীর্ষক কর্মশালা আয়োজন করে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা ডিয়াকোনিয়ার সহযোগীতায় উৎস কর্তৃক রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য পরিচালিত প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে নিয়মিত মনোসামাজিক স্বাস্থ্য সেবা দেয়া হচ্ছে। সম্পাদিত মানসিক স্বাস্থ্য সেবা দিতে গিয়ে আমাদের যে প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়েছে, তা বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের প্রতিপাদ্যের আলোকে পাঠকের জন্য পর্যালোচনা করতে চাই। পাশাপাশি আমাদের প্রত্যাশা মানসিক স্বাস্থ্য সেবা প্রদানে দক্ষ জনগোষ্ঠী গড়ে তুলতে আরো কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মনোযোগ আকর্ষণ করা। যাতে মনোসামাজিক বিপর্যয়ের মধ্যে থেকে ক্যাম্প জীবনে নানা সীমাবদ্ধতায় থাকা রোহিঙ্গাদের জন্য গুণগতমানের মানসিক স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা যায়।

ধন, সম্পদ, সম্পত্তি, বাসস্থান ওপ্রিয়জনকে ছেড়ে আত্মরক্ষায় পালিয়ে নাফ নদী পেরিয়ে বাংলাদেশে এসে ভুক্তোভোগী রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী গত দুই বছর মানসিক বিপর্যস্থতায় থেকে স্থায়ী মনোরোগীতে পরিণত হয়েছে এবং হচ্ছে। কারণ প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবার আওতায় এদের আনার জন্য সুসংগঠিত এবং মনোবৈজ্ঞানিক কার্যকর কোন কর্ম পরিকল্পনা অদ্যাবধি নেওয়া হয়নি। যদিও বিক্ষিপ্ত বিচ্ছিন্নভাবে সরকারী বেসরকারী পর্যায় থেকে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কাজ করা হচ্ছে। উৎস পরিচালিত মনোসামাজিক স্বাস্থ্য সেবা কার্যক্রমের অভিজ্ঞতা এবং সেক্টর ভিত্তিক নানা সভায় দিয়ে আমাদের কর্মী ও কর্মকর্তাদের ওই পর্যবেক্ষণ। কারণ সম্পাদিত প্রাসঙ্গিক সেবা, প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত এবং আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ যে প্রতিতির জন্ম দেয়; তা হল যথাযথ সেবা, যথাযথ সময়ে, যথাযথ দক্ষ মনোবৈজ্ঞানীক কর্মী-কর্মকর্তাদের দ্বারা না পেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী জটিল মানসিক রোগের রোগীতে পরিণত হচ্ছে। ফলে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো অদূর ভবিষ্যতে মনোসামাজিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভাগাড়ে পরিণত হবে। যা নিকট অতীতে অতিব দুঃখজনক পরিস্থিতির জন্ম দেবে। যার দায় রোহিঙ্গাদের জন্য কর্মরত সব পক্ষকেই নিতে হবে।

আমার ব্যক্তিগত পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণ থেকে দেখা যাচ্ছে যে, প্রতিটি ক্যাম্পেই কবর স্থানের জমির পরিমাণ বাড়ছে, বাড়ছে কবর স্থানের সংখ্যা, সেই সাথে বাড়ছে কবরের সংখ্যা। মৃতদের প্রতিদিনই দাফন করা হচ্ছে সে সব কবর স্থানে। কবরের জন্য চাহিদা মোতাবেক স্থান সংকুলান হচ্ছে না। নিহতরা যে শুধুমাত্র বার্ধক্যজনিত কারণে মারা গেছে তা নয়; কিংবা ওষধী চিকিৎসার অভাবে মারা যাচ্ছে এমনও নয়। প্রকৃত পক্ষে এ মৃত্যুর মিছিল স্বাভাবিক নয়। রোহিঙ্গাদের বিগত অভিজ্ঞতা, ভোগান্তি, আবেগগত বিপর্যস্থতা, শোকগ্রস্থতা তাদের মাঝে জন্ম দিচ্ছে হতাশা, বিষন্নতা, একাকীত্বতা, অনিশ্চয়তা, জীবনের প্রতি নেতিবাচক মনোভাবাপন্নতা। যা মানসিক রোগের প্রাথমিক লক্ষণ হিসাবে চিহ্নিত। ফলে মানসিক আলোচ্য বিপর্যস্থতা থেকে অনেকের মধ্যে পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডারসহ (PTSD) নানা জটিল মনোরোগের জন্ম নিয়েছে।

হতাশা, বিষন্নতা, আতঙ্কগ্রস্থতা, প্রিয়জন হারিয়ে সৃষ্ট মূহ্যমানতা, শোকগ্রস্থতা, মাতৃভুমি ত্যাগে বাধ্য হয়ে ন্যূনতম সযোগ-সুবিধায় বন্দি ক্যাম্প জীবন তাদের মধ্যে জন্ম দিচ্ছে জীবনের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। বেছে নিচ্ছে আত্মহননের পথ। যার প্রতিফলন হচ্ছে, মৃত্যুর মিছিল আর কবর স্থানের সংখ্যা। যদিও লোকলজ্জার ভয়ে আত্মহত্যাকারীর পরিবার পরিজন তা প্রকাশ করছে না। কিংবা তা যে নীরব আত্মহনন তা চিহ্নিত করতেই সমর্থ হচ্ছে না তাদের আত্মীয় পরিজন। তাই বৃহত্তর জনস্বার্থে বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘আত্মহত্যা প্রতিরোধে মানসিক স্বাস্থ্য সেবা’ এর প্রাসঙ্গিকতা বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট সকলের মনোযোগ আকর্ষণ করছি- যাতে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানবিক এ বিপর্যয় রোধে যে যার অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন এবং পর্যায়ক্রমে তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ যুগোপযোগী পদক্ষেপ নিয়ে আসন্ন বিপর্যস্থ পরিস্থিতি মোকাবেলায় গ্রহণযোগ্য উদ্যোগ নেন। অন্যথায় ইতিহাসের কাছে আমরা অপরাধী হিসাবে চিহ্নিত হব। ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না। এতিম, ধর্ষণের স্বীকার ও অনাকাংখিত গর্ভধারণকারী, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান, পিতা-মাতার নির্মম মৃত্যুর প্রত্যক্ষদর্শী হিসাবে বিপর্যস্থ আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা ভুক্তভোগী, আশ্রিত রোহিঙ্গাদের অপরাধ নয়। তাদের এ মানবিক বিপর্যয় মোকাবেলায় তথা ব্যবস্থাপনায় বা আত্মহননের মনভঙ্গিকে ইতিবাচক খাতে প্রবাহিত করতে অবশ্যই অনতিবিলম্বে তাদের মনোবৈজ্ঞানিক স্বাস্থ্য সেবার আওতায় আনতে হবে। কালক্ষেপণ এবং মনোসামাজিক স্বাস্থ্য সেবার অনুপস্থিতি ক্ষতিগ্রস্থদের ভোগান্তিকে দিন দিন ঘোলাটে ও জটিলতর করে তুলছে। দলীয় আত্মহত্যার শুরু হওয়ার আগেই এ প্রসঙ্গে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া সময়ের দাবি। বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের জন্য নির্ধারিত প্রতিপাদ্যের আলোকেই যা গ্রহণ করতে হবে।

মোদ্দাকথা, আত্মহত্যা প্রতিরোধে সমাজের সব স্তরে বিশেষ করে ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীকে প্রাধান্য দিয়ে যৌক্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ এবং তাদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে হবেই হবে। এটাই আমাদের অঙ্গিকার হওয়া আবশ্যক।

লেখক: নির্বাহী পরিচালক, উৎস

Share This Post

আরও পড়ুন