মঙ্গলবার, ১৭ মে ২০২২, ০১:০২ পূর্বাহ্ন

আজ বিশ্ব উচ্চ রক্ত চাপ দিবস: উচ্চ রক্ত চাপের ঝুঁকি কমাতে পরামর্শ জেনে নিন

ডাক্তার মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
  • প্রকাশ : সোমবার, ১৭ মে, ২০২১
  • ৮৬ Time View
ডাক্তার মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ

ডাক্তার মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ: আজ ১৭ মে (সোমবার) বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবস। বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাসের কারণে বিশ্বের অন্য দেশের মত বাংলাদেশেও দিনটি উপলক্ষে তেমন কোন কর্মসূচি থাকছে না।

বাংলা কথা রক্ত চাপ। কিন্তু ইংরেজীটাই পরিচিতি বলে বাংলা বুঝি না। এ ব্লাড প্রেসার নামক রোগটি আজকাল ব্যাপকভাবে প্রসার লাভ করেছে। যে কোন রোগীই ডাক্তার খানায় গিয়ে বলে থাকেন, ডাক্তার সাহেব, আমার প্রেসারটা একটু দেখেন তো। এটির সাধারণতঃ শহরের ধনী ও বিলাসী ব্যক্তিদের রোগ। খেটে খাওয়া বা দিন মজুর মানুষের এ রোগ হয় না। আর হলেও তা উচ্চ রক্ত চাপ হয় না, নিম্ন চাপেই থাকে।

এখন বুঝতে হবে এ রক্ত চাপটি কি? উচ্চ রক্তচাপ ইহার ভাবী ফল অত্যন্ত ভয়ানক, আশংকা জনক। হৃৎপিন্ডের স্পন্দন দ্বারা যে শক্তি চালিত হয়, তাই-ই উচ্চ রক্তচাপ। ব্লাড প্রেসার অন্য রোগের লক্ষণ মাত্র। কোন সময় রক্তচাপ অত্যন্ত বেড়ে যায়, কোন সময় কমে যায়, শির পীড়া, মাথা ঘুরা, বুকে চাপ বোধ, বুক ধড়ফড় করা, মাথা ভার বোধ, শারীরিক পরিশ্রমে অনীহা, শ্বাস কষ্ট, হাঁপানীর মত অবস্থা, নিদ্রা কমে যায়, মাঝে মাঝে নাসিকা হতে রক্ত পড়ে। আরো অনেক লক্ষণ আসতের পারে। মাথায় রক্ত উঠে অস্থিরতা, চিলিক মারা মাথা ব্যথা, চোখ, মুখ লাল তন্দ্রাচ্ছন্নভাব কিংবা সংজ্ঞাহীন অবস্থা।

হৎপিণ্ড সঙ্কোচ-প্রসারণের ফলে রক্তনালীর মাধ্যমে সারা দেহে রক্ত সঞ্চালিত হয়। রক্তনালীর মাধ্যমে প্রবাহিত হওয়ার সময় রক্ত ধমনীর গায়ে যে চাপ সৃষ্টি করে, তাই ব্লাড প্রেসার বা উচ্চ রক্ত চাপ।

রক্ত চাপের দু’টি মান থাকে সিস্টোলিক এবং ডায়াস্টোলিক। হৃৎপিণ্ড সঙ্কোচনের সময় ব্লাড প্রেসার বেশি হয়। হৃৎসঙ্কোচনের ফলে ধমনীর গায়ে সৃষ্ট এ রক্তচাপকে ‘সিস্টোলিক’ ব্লাড প্রেসার বলে। অপর পক্ষে হৃৎপিণ্ড যখন প্রসারিত হয়, তখন ধমনীর গায়ে রক্তের চাপ পড়ে কম। হৃৎ প্রসারণকালের এ রক্ত চাপকে বলে ‘ডায়াস্টোলিক রক্তচাপ’।

ধরুন চিকিৎসক আপনার ব্লাড প্রেসার মেপে বললেন, আপনার ব্লাড প্রেসার ১১০/৭০ (মিমি পারদ)। এখানে বুঝতে হবে আপনার ‘সিস্টোলিক’ ব্লাড প্রেসার ১১০ এবং ডায়াস্টোলিক ব্লাড প্রেসার ৭০।

উচ্চ রক্তচাপ বৃদ্ধির কারণ: শতকরা পাঁচ ভাগ ক্ষেত্রে হাই ব্লাড প্রেসারের কারণ জানা যায়। যে সব হাই ব্লাড প্রেসারের কারণ জানা যায়, তাদের বলা হয়, সেকেন্ডারি হাইপারটেনশন (উচ্চ রক্ত চাপ)। এসব কারণের মধ্যে রয়েছে কিডনির অসুখ, এড্রেনাল গ্লান্ডের অসুখ ইত্যাদি।

শতকরা ৯৫ ভাগ ক্ষেত্রে হাই ব্লাড প্রেসারের কারণ জানা যায় না। কারণ না জানা এ উচ্চ রক্ত চাপকে বলা হয়, এসেনসিয়াল হাইপারটেনশন।

১৯৩০-১৯৪০ সালের দিকে কিছু প্রভাবশালী চিকিৎসক বিশ্বাস ও প্রচার করতেন যে, সরু ও অনমনীয় রক্তনালীর ভেতর দিয়ে রক্ত প্রবাহিত করতে ব্লাড প্রেসার বৃদ্ধি অপরিহার্য, বিশেষত বয়োবৃদ্ধির সাথে সাথে। তারা এটাও বলতেন, এ ব্লাড প্রেসার বৃদ্ধিতে মৃত্যুঝুঁকি বাড়ে না। অনেক সময় পেরিয়েছে, অনেক সমীক্ষা ও গবেষণা হয়েছে; আজ এটা প্রতিষ্ঠিত যে, ব্লাড প্রেসার বৃদ্ধি অপরিহার্য নয় বা তা বয়োবৃদ্ধির অত্যাবশ্যকীয় পরিণতি নয় বরং ব্লাড প্রেসার বৃদ্ধিতে রক্ত সংবহনতন্ত্রের বিভিন্ন জটিলতা এবং মৃত্যুঝুঁকি বাড়ে। আগের ধারণার আমূল পরিবর্তন ঘটেছে কিন্তু নামটা এখনো রয়ে গেছে- অপরিহার্য উচ্চ রক্ত চাপ। এসেনসিয়াল হাইপারটেনশন বা অপরিহার্য উচ্চ রক্তচাপের সঠিক কারণ জানা না গেলেও জানা গেছে, কিছু প্রভাবকের কথা যা উচ্চ ব্লাড প্রেসার হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। এগুলোকে বলা হয় ঝুঁকিপূর্ণ প্রভাবক। উল্লেখযোগ্য ঝুঁকিপূর্ণ প্রভাবকগুলো হল- বংশগত ধারা, বয়স, গোত্র, কম শারীরিক পরিশ্রমযুক্ত জীবনযাত্রা, মানসিক চাপ, ধূমপান, মদ্যপান, মেদবাহুল্য ইত্যাদি। ৯০ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে উচ্চ রক্তচাপের কোন নির্দিষ্ট কারণ জানা যায় না, একে প্রাইমারি বা অ্যাসেনশিয়াল রক্তচাপ বলে। সাধারণত বয়স্ক মানুষের উচ্চ রক্তচাপ বেশি হয়ে থাকে।

কিছু কিছু বিষয় উচ্চ রক্ত চাপের আশঙ্কা বাড়ায়, যা নিচে আলোকপাত করা হল-
উচ্চ রক্ত চাপের বংশগত ধারাবাহিকতা আছে, যদি বাবা-মায়ের উচ্চ রক্তচাপ থাকে, তবে সন্তানেরও এ রোগ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এমনকি নিকটাত্মীয়ের উচ্চ রক্তচাপ থাকলেও অন্যদের এর ঝুঁকি থাকে।
ধূমপান: ধূমপায়ী ব্যক্তির শরীরে তামাকের নানা রকম বিষাক্ত পদার্থের প্রতিক্রিয়ায় উচ্চ রক্তচাপসহ ধমনি, শিরার নানা রকম রোগ ও হৃদ রোগ দেখা দিতে পারে।
অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ: খাবার লবণে সোডিয়াম থাকে, যা রক্তের জলীয় অংশ বাড়িয়ে দেয়। ফলে রক্তের আয়তন ও চাপ বেড়ে যায়।
অধিক ওজন ও অলস জীবনযাত্রা: যথেষ্ট পরিমাণে ব্যায়াম ও শারীরিক পরিশ্রম না করলে শরীরের ওজন বেড়ে যেতে পারে। এতে হৃদ্যন্ত্রে অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয়। অধিক ওজনসম্পন্ন লোকদের উচ্চ রক্তচাপ হয়ে থাকে।
অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস: অতিরিক্ত চর্বি জাতীয় খাবার, যেমন—মাংস, মাখন ও ডুবো তেলে ভাজা খাবার খেলে ওজন বাড়ে। ডিমের হলুদ অংশ এবং কলিজা, গুর্দা, মগজ এসব খেলে রক্তে কোলেস্টেরল বেড়ে যায়। রক্তে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল হলে রক্তনালির দেয়াল মোটা ও শক্ত হয়ে যায়। ফলে রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে।
ডায়াবেটিস: বয়সের সঙ্গে সঙ্গে ডায়াবেটিসের রোগীদের উচ্চ রক্তচাপ দেখা দেয়। এ ছাড়া তাঁদের অন্ধত্ব ও কিডনির নানা রকম রোগ হতে পারে।
অতিরিক্ত উৎকণ্ঠা: অতিরিক্ত রাগ, উত্তেজনা, ভীতি এবং মানসিক চাপের কারণেও রক্তচাপ সাময়িকভাবে বেড়ে যেতে পারে। যদি এ মানসিক চাপ অব্যাহত থাকে এবং রোগী ক্রমবর্ধমান মানসিক চাপের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারেন, তবে এ উচ্চ রক্তচাপ স্থায়ী রূপ নিতে পারে।
কিছু কিছু রোগের কারণে উচ্চ রক্তচাপ হতে পারে।

নির্দিষ্ট কারণ খুঁজে পাওয়া গেলে একে বলা হয় সেকেন্ডারি হাইপারটেনশন। এ কারণগুলোর মধ্যে কয়েকটি হল-

কিডনির রোগ; অ্যাড্রেনাল গ্রন্থি ও পিটুইটারি গ্রন্থির টিউমার; ধমনির বংশগত রোগ; গর্ভধারণ অবস্থায় একলাম্পসিয়া ও প্রি এ্যাকলাম্পসিয়া হলে; অনেক দিন ধরে জন্ম নিয়ন্ত্রণের বড়ির ব্যবহার, স্টেরয়েড জাতীয় হরমোন গ্রহণ এবং ব্যথা নিরামক কিছু কিছু ওষুধ খেলে।

উচ্চ রক্ত চাপের ঝুঁকি কমাতে পরামর্শ: জীবন যাত্রর পরিবর্তন এনে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। বংশগতভাবে উচ্চ রক্তচাপ থাকলে তা কমানো সম্ভব নয়। তবে এ রকম ক্ষেত্রে যেসব উপাদান নিয়ন্ত্রণ করা যায়, সেগুলোর ব্যাপারে বেশি মনোযোগী হওয়া উচিত।
অতিরিক্ত ওজন কমাতে হবে: খাওয়া-দাওয়া নিয়ন্ত্রণ ও নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে। এক বার লক্ষ্য অনুযায়ী ওজনে পৌঁছালে সীমিত আহার করা উচিত এবং ব্যায়াম অব্যাহত রাখতে হবে। ওষুধ খেয়ে ওজন কমানো বিপজ্জনক। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওজন কমানোর ওষুধ না খাওয়াই ভালো।
খাদ্য গ্রহণের ক্ষেত্রে সতর্কতা: কম চর্বি ও কম কোলেস্টেরলযুক্ত খাবার গ্রহণ করতে হবে। যেমন-খাসি বা গরুর মাংস, কলিজা, মগজ, গিলা, ডিম কম খেতে হবে। কম তেলে রান্না করা খাবার এবং ননী তোলা দুধ, অসম্পৃক্ত চর্বি যেমন-সয়াবিন, ক্যানোলা, ভুট্টার তেল অথবা সূর্যমুখীর তেল খাওয়া যাবে। বেশি আঁশযুক্ত খাবার গ্রহণ করা ভালো। আটার রুটি এবং সুজি-জাতীয় খাবার পরিমাণ মত খাওয়া ভালো।
লবণ নিয়ন্ত্রণ: তরকারিতে অতিরিক্ত লবণ পরিহার করতে হবে।
মদ্যপান: মদ্যপান পরিহার করতে হবে।
নিয়মিত ব্যায়াম: সকাল-সন্ধ্যা হাঁটাচলা, সম্ভব হলে দৌড়ানো, হালকা ব্যায়াম, লিফটে না চড়ে সিঁড়ি ব্যবহার ইত্যাদি।
ধূমপান বর্জন: ধূমপান অবশ্যই বর্জনীয়। ধূমপায়ীর সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকুন। তামাক পাতা, জর্দা, গুল লাগানো ইত্যাদি পরিহার করতে হবে।
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ: যাঁদের ডায়াবেটিস আছে, তা অবশ্যই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
মানসিক ও শারীরিক চাপ সামলাতে হবে। নিয়মিত বিশ্রাম, সময়মতো ঘুমানো, শরীরকে অতিরিক্ত ক্লান্তি থেকে বিশ্রাম দিতে হবে। নিজের শখের কাজ করা ইত্যাদির মাধ্যমে মানসিক শান্তি বেশি হবে।
রক্ত চাপ নিয়মিত পরীক্ষা: নিয়মিত চিকিৎসকের কাছে গিয়ে রক্তচাপ পরীক্ষা করানো উচিত। যত আগে উচ্চ রক্তচাপ ধরা পড়ে, তত আগে নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং জটিল রোগ বা প্রতিক্রিয়া থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

হোমিওপ্রতিকার: রোগ নয় রোগীকে চিকিৎসা করা হয়, এ জন্য রোগীর পুরা লক্ষণ মিলিয়ে চিকিৎসা দিতে পারলে তাহলে হোমিওতে উচ্চ রক্ত চাপ রোগীর চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব। অভিজ্ঞ হোমিও চিকিৎসকরা উচ্চ রক্ত চাপের জন্য যে সব ওষুধ ব্যবহার করে থাকেন, একোনাইট, এড্রিনালিন, অরামমেট, ক্যাকটাস গ্র্যান্ডি, কেলিফস, নেট্রাম মিউর, ক্যাটে গ্র্যাস, সেফালেন্ড্রা ইন্ডিকা, অর্জুনসহ আরো অনেক মেডিসিন লক্ষণের উপর আসতে পারে। তবে সাবধান চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবন করলে রোগ আরো জটিল আকারে পৌঁছাতে পারে।

লেখক: কো-চেয়ারম্যান, হোমিও বিজ্ঞান গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র

Share This Post

আরও পড়ুন