রবিবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২২, ০২:৪১ পূর্বাহ্ন

অসীম দাশ, আদর করে বকা দিতেন

নুরুন্নবী নুর
  • প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর, ২০২০
  • ৩৬৪ Time View

নুরুন্নবী নুর: প্রিয় স্যার অসীম দাশ। প্রিয় বলার পিছনে অনেক গল্প আছে, আছে অনেক স্মৃতি। মানুষ এমনিতে প্রিয় হয়ে ওঠেন না। ব্যক্তির কাজে-কর্মে প্রিয় হয়ে যান। আমার বিভাগীয় পরম শিক্ষক তিনি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি), নাট্যকলা বিভাগের একজন সম্মানিত শিক্ষক। আমি এখন প্রাক্তন। বিভাগ থেকে অনার্স-মাস্টার্স শেষ করে আসার পর, যে কয় জন শিক্ষক আমার জীবনে বড় একটা জায়গা জুড়ে রয়েছেন, তাঁদের মধ্যে গুরু অসীম দাশ অন্যতম।

আমার এখনও মনে আছে, প্রথম বর্ষে তিনি আমাদের ‘মুভমেন্ট, ভয়েস অ্যান্ড স্পীচ’ এর ওপর পাঠদান দিয়েছিলেন। দ্বিতীয় বর্ষে ‘প্লে প্রোডাশান’; তৃতীয় বর্ষে ওয়েস্টার্ন ড্রামা, ‘ডিরেকশান’, ‘সেনিক ডিজাইন’ এবং ‘স্টেইজ লাইটিং’, তাছাড়া শেষ বর্ষে এসে আবারও ডিরেকশানসহ ‘থিয়েটার প্রেকটিস অব ইস্ট অ্যান্ড ওয়েস্ট (বিংশ ও একবিংশ শতাব্দী)’, ‘সেট অ্যান্ড লাইট ডিজাইনিং’।

সব মিলিয়ে থিয়েটারের গুরুত্বপূর্ণ পাঠদানগুলো খুব যত্ন সহকারে, তিনি আমাদের শিখিয়েছিলেন। তিনি নিয়মিত পাঠদান দিতে শ্রেণি কক্ষে চলে আসতেন। কোন দিন সময়ের বাইরে অর্থাৎ দেরিতে আসতেন না। উল্টো শিক্ষার্থী হিসেবে আমাদের দেরি হয়ে যেত। দেরি হলেও আদর করে বকা দিতেন। কোন দিন কটু কথা বলেন নি। আমরা প্রত্যেক শিক্ষার্থীদের মধ্যে উঁনার সম্পর্কে সব সময় একটা ইতিবাচক ধারণা থাকত। আমরা খুব অনুসরণ করতাম।

মাস্টার্সে আমাদের চারটা বিভাগ ছিল। এগুলো নির্দেশনা, অভিনয়, নাটক রচনা ও ডিজাইনিং। অবশ্য ডিজাইনিংটা পরে বাদ দেয়া হয়। নির্দেশনা গ্রুপের দেখ-ভাল করেন অসীম দাশ স্যার। আমার লেখা-লেখিতে অভ্যাস থাকা সত্ত্বেও অন্য শিক্ষকদের অনুরোধে ও অসীম দাশ স্যার গ্রুপটাতে থাকাতে ‘নির্দেশনা’য় মাস্টার্স করার সিদ্ধান্ত নিই। আমরা নির্দেশনাকে ‘ডিরেকশান’ বলতে বেশি সাচ্ছন্দ্য বোধ অনুভব করতাম।

স্যার খুব অনুপ্রেরণা দিতেন। ডিরেকশানের নানা বিষয়ে বলতেন। ডিরেকশান বিভাগের ১০টি কোর্সের মধ্যে তিনি আমাদের ‘শেক্সপেরিয়ান ড্রামা’, ‘থিয়েটার মেকিং প্রিন্সিপলস্ (সেট, লাইট, কস্টিউম অ্যান্ড ম্যাক-আপ)’, ‘গ্রিক ক্লাসিসিজম অ্যান্ড নিউ ক্লাসিসিজম’, ‘মডার্ন ডিরেক্টর’স থট’ এবং ‘প্লে প্রোডাকশান’ বিষয়ে পড়িয়েছিলেন। তাঁর পড়ানোতে বিন্দুমাত্র অবহেলার ছিটেফোঁটা ছিল না। কোর্সগুলোর বাইরেও নির্দেশনার নানান খুঁটিনাটি বিষয়ে আমাদের বলতেন। বলতেন, পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের নির্দেশকদের উত্থান ও পতনের গল্প।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সাত বছরে, যে কয় জন শিক্ষক আমাদের প্রকৃত শিক্ষাদান দিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে অসীম দাশ স্যারকে সবার উপরে রাখব। দীর্ঘ সময়ে উঁনাকে নানাভাবে বিভাগে পেয়েছি, প্রভাষক থেকে শুরু করে সহকারী অধ্যাপক। তন্মধ্যে তিনি বিভাগীয় সভাপতি পদেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন। বর্তমানে সহকারী অধ্যাপক পদে বহাল আছেন। সভাপতি থাকাকালীন; তিনি, আমরা শিক্ষার্থীদের সব আবদার মেনে নিতেন। বিভাগীয় শিক্ষার্থী ছাড়াও নিজের সন্তানদের মতো আচরণ পেতাম। আমাদের যে কোন জটিল আবদার, তিনি হাসি মুখে সমাধান দিতেন। কোনো দিন নারাজ হয়ে অফিস কক্ষ ত্যাগ করিনি। এখনও তিনি মাঝে-মধ্যে আমরা প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের খোঁজ-খবর নেন।

একজন মহৎ হৃদয়ের মানুষ আমাদের অসীম স্যার। আজ ২৬ নভেম্বর, প্রিয় স্যারের জন্মদিন। এমন দিনে বিভাগে থাকা সময়ে স্যারকে আমরা সবাই গিয়ে অফিসে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতাম।

আমরা বিভাগ থেকে প্রস্থান করলেও স্যারকে এতটুকু ভুলিনি। স্যার সব সময় আমাদের পাশে থেকেছেন, থাকছেন, থাকবে। এটাই আমরা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি। আমরা নাট্যকলা বিভাগ, চতুর্থ ব্যাচের পক্ষ থেকে স্যারকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করছি। আমরা স্যারের দীর্ঘায়ু কামনা করি, যাতে তিনি আমাদের মাঝে দীর্ঘ দিন বেঁচে থাকেন। স্যারের কর্মময় জীবন আরও উজ্জ্বল হোক, সে আশা রেখেই লেখার সমাপ্তি ঘোষণা করলাম।

লেখক: প্রাক্তন শিক্ষার্থী
নাট্যকলা বিভাগ, চবি

Share This Post

আরও পড়ুন