বৃহস্পতিবার, ০৬ মে ২০২১, ০৯:৩৬ অপরাহ্ন

অভাবের কাছে ভালোবাসা এভাবে হার মানবে, বউ কখনো ভাবেনি

নুরুন্নবী নুর / ১০১ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে
প্রকাশের সময় : শনিবার, ১৬ জানুয়ারী, ২০২১

চলচ্চিত্র গুরু মৃণাল সেনের অনন্য সৃষ্টি বাংলা চলচ্চিত্র ‘বাইশে শ্রাবণ (১৯৬০)’। ইংরেজি শিরোনাম ‘দ্যা সেকেন্ড অফ শ্রাবণ।’ এটি একটি বাংলা ভাষার ক্ল্যাসিকাল ড্রামাধর্মী চলচ্চিত্র। তার তৃতীয় এই চলচ্চিত্র ‘বাইশে শ্রাবণ’ থেকে তিনি আন্তর্জাতিক পরিচিতি পান। চলচ্চিত্রের কাহিনীতে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ তারিখ বাইশে শ্রাবণ, যাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয় নানা নাটকীয় রোমাঞ্চকর ঘটনা।

চলচ্চিত্রের নামের সাথে কাহিনির মিল খুঁজে না পাওয়া গেলেও একটু পড়াশোনা করলেই নামকরণের বিষয় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনেক তাত্ত্বিক কথা উঠে আসতে বাধ্য। চলচ্চিত্রটি দেখার পর নামের সাথে কাহিনিকে কোনভাবেই মিলাতে পারছি না, বিষয়টা নিয়ে একটু ভাবনার মধ্যে পড়ে গিয়েছিলাম।

লেখক সাগর চৌধুরীর মতে, ‘বিশিষ্ট চলচ্চিত্র পরিচালক মৃণাল সেনের তৈরি একটি ছায়াছবির নাম ‘বাইশে শ্রাবণ’। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের পটভূমিতে এক মধ্য বয়স্ক ট্রেনের ফেরিওয়ালা আর তার ষোড়শী বধূর মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েনের বিষাদমধুর কাহিনী।

বাইশে শ্রাবণ এই অসম বয়সী দম্পতির বিবাহের তারিখ। কিন্তু কেন ‘বাইশে শ্রাবণ’? শুনেছি ছবিটি মুক্তি পাওয়ার পর কেউ একজন পরিচালককে এই প্রশ্নটা করলে মৃণাল সেন নাকি স্বভাব সিদ্ধ ভঙ্গিতে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘একজন মহাপুরুষের মৃত্যুর তারিখ বাইশে শ্রাবণ বলেই সেটা কারো বিয়ের বা অন্য কিছুর তারিখ হতে পারবে না, এমন তো কোন কথা নেই!’ জানি না সত্যিই তিনি একথা বলেছিলেন কিনা, আমি কেবল এমনটা শুনেছি, তবে বলে থাকতেও পারেন।”

‘বাইশে শ্রাবণ’ সত্যিই ভালো একটি চলচ্চিত্র।ষাটের দশকে নির্মিত চলচ্চিত্রটি তৈরিতে মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন নির্মাতা। নির্মাতা মৃণাল সেন তার শুরুর দিকের চলচ্চিত্রগুলোকে খুব যত্নের সাথে বানানোর জন্য উদ্যোগী ছিলেন।

মৃণাল সেনের কাজে ভালো ভালো কলাকুশলির সহায়তা ছিল। যেমন সংগীতের ক্ষেত্রে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় তো তার সাথে লেগেই ছিলেন।সংগীতের নিপুণ ব্যবহারের কারণে শুরুর দিকের মৃণাল সেনের চলচ্চিত্রগুলো দর্শকের নজরে আসে, যা চলচ্চিত্রগুলোকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করে। সে রকম একটি চলচ্চিত্র ‘বাইশে শ্রাবণ’ও, যেখানে সংগীত পরিচালক ছিলেন গুণী শিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়।

‘বাইশে শ্রাবণ’ চলচ্চিত্রের মূল গল্পের
কাহিনিটি ছিলো দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের ঠিক আগ মুহূর্ত ঘটনার স্থানটি ছিলো বাংলার একদম প্রত্যন্ত অঞ্চলে গ্রামীণ এলাকায়। প্রিয় নাথ নামের একজন বনেদী পরিবারের মধ্য বয়স্ক সন্তান, তার মায়ের পছন্দ অনুযায়ী বিয়ে করেন সুন্দরী একজন অল্প বয়সী মেয়েকে। সে নতুন বউয়ের সাথে খুব সাধারণ দাম্পত্য জীবনযাপন শুরু করে।

যতই দিন যায় প্রিয় নাথের বয়স ততই বাড়তে থাকে, ফলে নিজেকে কর্মক্ষেত্রে আগের চেয়ে মেলে ধরতে না পারার কারণে জীবনটা কঠিনের দিকে চলে যেতে থাকে। সে লোকাল ট্রেনে একটি কোম্পানীর অধীনে চাকরি হিসেবে বিভিন্ন প্রসাধনী সামগ্রি বিক্রি করত।

একদিন স্থানীয় এক মেলায় বউকে নিয়ে গেলে, শুরু হয় প্রচণ্ড বৃষ্টি, বৃষ্টি থেকে তুফান। নিজের ঘর মেরামত করা হলেও মায়ের ঘর করা হয়নি। মা ছেলেকে বলেনি তা কিন্তু না, ছেলে অবহেলা করেছিল, ফলে মেলা থেকে আসার আগে মায়ের ঘর তুফানে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়, মা মারা যান। অবশেষে প্রিয় নাথ ভুল বুঝতে পেরে অনুশোচনায় ভুগতে লাগলেন।

চলন্ত অবস্থায় এক বগি থেকে অন্য বগিতে যেতে হত প্রিয় নাথকে। কিন্তু বয়সের কারণে শরীর দুর্বল হয়ে আসে, যেতে পারে না এক বগি থেকে অন্য বগিতে, তেমন বিক্রি হয় না। কোম্পানির গাল মন্দের শিকার হয়। নতুন আসা তরুণদের সাথে তাল মিলাতে পারে না, ফলে চাকরি হারাতে হয় তাকে। অভাব দেখা দেয় সংসারে। দেখা দেয় দুর্ভিক্ষ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রস্তুতির হেতু সে সময়ে গ্রামে মিলিটারিরাও আসে। সে ভয় পায় না, গ্রামের মানুষগুলো নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেলেও প্রিয়নাথ থেকে যায় গ্রামে।

তিন দিন উপোস থাকার পর খাবারের সন্ধান মিললেও প্রিয় বউটির জন্য যৎসামান্য না রেখে নিজের উদর পূর্তি করে। বউয়ের প্রতি এতো ভালোবাসা থাকার পরও অভাবের কাছে ভালোবাসা এভাবে হার মানবে, বউ কখনো ভাবেনি। বউ মালতীর উপোসের অভ্যাস আছে। কিন্তু স্বামীর এরূপ অবহেলা, অযত্ন ও স্বার্থপরতা, সে কোনভাবেই মেনে নিতে পারে না। প্রিয়নাথ ও মালতীর দাম্পত্য জীবনে দেখা দেয় বিশৃঙ্খলা।এক দিন মালতীর সঙ্গে প্রিয় নাথের তুমুল ঝগড়া হয়। প্রিয়নাথ ঘর থেকে বের হয়ে চলে যায়। কিন্তু বউয়ের প্রতি ভালোবাসার কারণে সে আবার ঘরে ফিরে, এসে দেখে মালতী আর নেই, অপমানে ঘরে ফাঁসি খেয়েছে।

৮১ মিনিট ৫৭ সেকেন্ড বিশিষ্ট ‘বাইশে শ্রাবণ’ চলচ্চিত্রে প্রিয় নাথ চরিত্রে গণেশ মুখোপাধ্যায়ের অভিনয় অসাধারণ। একটুও মনে হয়নি প্রিয় নাথই গণেশ। গণেশ প্রিয় নাথ চরিত্রটি ফুটিয়ে তুলেছেন বাস্তব সম্মত করে। অন্য দিকে, প্রিয় নাথের স্ত্রী মালতী চরিত্রে মাধবী মুখোপাধ্যায়ও অনবদ্য ও মনে রাখার মতো অভিনয় করেছেন।প্রিয় নাথের মায়ের চরিত্র হেমাঙ্গিনী দেবীও ভালো অভিনয় করেছেন। এছাড়াও সুমিতা দাশগুপ্তা ও উমানাথ ভট্টাচার্য্য কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলোকে ভালো সঙ্গ দিয়ে চলচ্চিত্রটিকে একটা উন্নত জায়গায় নিয়ে গেছে বলতে হবে।

চিদানন্দ দাশগুপ্তের গল্প অবলম্বনে
‘কল্লোল ফিল্মস্’ নিবেদনে বিজয় ভট্টাচার্য ও অশোক রায়ের প্রযোজনায় ‘বাইশে শ্রাবণ’ চলচ্চিত্রটি নির্মিত। এতে ক্যামেরায় ছিলেন শৈলজা চট্টোপাধ্যায়, আর্ট ডিরেকশনে বংশী চন্দ্রগুপ্ত, ইডিটিংয়ে সুবোধ রায় এবং স্ক্রিনপ্লে ও ডিরেকশনে মৃণাল সেন নিজেই।

রিভিউ দিয়েছেন নুরুন্নবী নুর

add

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ